সোমবার ২৫ মে ২০২৬ - ০৯:৪১
পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধ থেকে অর্থনৈতিক সংগ্রাম পর্যন্ত— যেখানে প্রতিরোধ করেছি, সেখানেই সফলতা এসেছে

ইরানের শহীদ সর্বোচ্চ নেতা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী (রহ.)’র মতে, “শত্রুর ভয়ই দুর্ভাগ্যের সূচনা” এবং “বিচক্ষণ ও সাহসী প্রতিরোধই” একটি জাতিকে নিরাপদ রাখতে পারে। তাঁর দৃষ্টিতে প্রতিরোধ কেবল সামরিক অঙ্গনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও এটি একটি অপরিহার্য নীতি।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: এ আলোচনায় প্রতিরোধের সংজ্ঞা, এর সুফল, মসজিদ ও যুবসমাজের ভূমিকা এবং কুরআনের বিজয়ের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে:

যেখানে প্রতিরোধ করেছি, সেখানেই ফল পেয়েছি
“প্রতিরোধ হচ্ছে যে কোনো স্বাধীনচেতা ও মর্যাদাবান জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া জুলুম ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।”
(১৪০০/৩/১৪ — ৪ জুন ২০২১)

শত্রুর মোকাবিলায় প্রতিরোধের বিষয়টি সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী-এর চিন্তাধারায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তাঁর বক্তব্যে প্রতিরোধের গুরুত্ব, সুফল ও বাস্তব উদাহরণ বারবার উঠে এসেছে।

শত্রুর ভয়ই দুর্ভাগ্যের শুরু
তিনি বলেন, কোনো দেশের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি হলো— দেশটির দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যদি শত্রুর হুমকি, ভয়ভীতি ও রূঢ় আচরণে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কারণ তারা ভীত হয়ে পড়লে, বাস্তবে শত্রুর অনুপ্রবেশ ও আগ্রাসনের পথই খুলে দেয়।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, কাজ অবশ্যই জ্ঞান, যুক্তি ও প্রজ্ঞার সঙ্গে করতে হবে; তবে একই সঙ্গে সাহসিকতাও থাকতে হবে। শক্তিধরদের রাগ, হুমকি কিংবা ভ্রুকুটিতে প্রভাবিত হওয়াই একটি জাতির দুর্ভাগ্যের সূচনা।
[১৩৯৬/১/৩০ — ১৯ এপ্রিল ২০১৭]

প্রতিরোধের অর্থ কী?
তিনি বলেন, প্রতিরোধের অর্থ হলো— মানুষ এমন একটি পথ বেছে নেবে, যাকে সে সত্য ও সঠিক বলে বিশ্বাস করে এবং এরপর সে পথে চলতে থাকবে; কোনো বাধাই যেন তাকে সেই পথ থেকে ফিরিয়ে দিতে বা থামিয়ে দিতে না পারে।
[১৩৯৮/৩/১৪ — ৪ জুন ২০১৯]

সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ আরও গুরুত্বপূর্ণ
প্রতিরোধের কথা উঠলেই সাধারণত মানুষের মনে সামরিক বা নিরাপত্তা প্রতিরোধের বিষয়টি আসে। অথচ তাঁর মতে, এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ।

তিনি বলেন, দেশের সাংস্কৃতিক দুর্গ ও প্রতিরক্ষা যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে সবকিছু হারিয়ে যেতে পারে। শত্রুর মূল লক্ষ্য হলো ধর্মীয় ঈমান ও সেই বিশ্বাস, যা ইসলামী ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তুলেছে।
[৩১/৫/১৩৯৫— ২১ আগস্ট ২০১৬]

কুরআন প্রতিরোধের চূড়ান্ত বিজয়ের সুসংবাদ দেয়
তিনি বলেন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বহুবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, সত্যের অনুসারীরাই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবে। যারা সত্য ও প্রতিরোধের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে, তারা আসলে নিজেরাই নিজেদের ধ্বংসের ফাঁদ তৈরি করে।

তিনি কুরআনের বিভিন্ন আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, যারা আল্লাহর পথে অবিচল থাকবে, আল্লাহ তাদের সাহায্য করবেন এবং তাদের পদক্ষেপ দৃঢ় করবেন।
[১৩৯৮/৩/১৪ — ৪ জুন ২০১৯]

প্রতিরোধ ভয় ও হতাশা দূর করে
তিনি বলেন, ভয় ও হতাশা একটি জাতির জন্য বড় দুটি বিপদ। কিন্তু প্রতিরোধ ও অবিচলতার মাধ্যমে এ দুই বিপদ দূর হয়ে যায়।

তিনি কুরআনের আয়াত উল্লেখ করে বলেন, যারা বলে “আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ” এবং এরপর অবিচল থাকে, ফেরেশতারা তাদের কাছে নেমে এসে বলে— “ভয় করো না, দুঃখ করো না।”
[১৩৯৯/৬/৩১ — ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০]

আত্মসমর্পণের কষ্ট প্রতিরোধের চেয়ে বেশি
তিনি বলেন, প্রতিরোধ ও দৃঢ়তার পথে অবশ্যই কষ্ট আছে; কিন্তু আত্মসমর্পণের কষ্ট আরও ভয়াবহ। কারণ প্রতিরোধের পথে যে কষ্ট সহ্য করা হয়, আল্লাহ তা নেক আমল হিসেবে গণ্য করেন। অথচ জুলুমের কাছে আত্মসমর্পণ করলে কোনো সওয়াব তো নেইই, বরং তার জন্য শাস্তিও রয়েছে।
[১৩৯৮/৮/২৪ — ১৫ নভেম্বর ২০১৯]

ইমাম খোমেনী (রহ.) জাতিকে প্রতিরোধের শিক্ষা দিয়েছেন
তিনি বলেন, রুহুল্লাহ খোমেনী (রহ.)’র অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য ছিল— তিনি জাতিকে প্রতিরোধের শিক্ষা দিয়েছেন। চাপের মুখে পিছু না হটে কীভাবে দৃঢ় থাকতে হয়, তা তিনি জাতিকে শিখিয়েছেন। ফলে আজ ইরানের জাতি একটি শক্তিশালী ও প্রতিরোধী জাতিতে পরিণত হয়েছে।
[১৪০১/৩/১৪ — ৪ জুন ২০২২]

শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের তত্ত্ব প্রচার করুন
তিনি যুবকদের উদ্দেশে বলেন, শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চিন্তা ও তত্ত্বকে প্রচার করতে হবে। শুধু শত্রুর কাছে অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রচারযন্ত্র আছে বলেই পিছু হটার কোনো কারণ নেই।

তিনি বলেন, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, উত্তর আফ্রিকা ও উপমহাদেশের বহু তরুণ আজ আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, এবং এটি তাদের ন্যায্য অধিকার।
[১৩৯৭/৮/১২ — ৩ নভেম্বর ২০১৮]

মসজিদ হলো প্রতিরোধের কেন্দ্র
তিনি বলেন, মসজিদ হচ্ছে সাংস্কৃতিক জাগরণ ও সামাজিক আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। ওয়াজ-মাহফিল, রোওজাখানি ও ধর্মীয় সমাবেশগুলোকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই; এগুলোর প্রভাব অনেক ক্ষেত্রেই গণমাধ্যম ও ভার্চুয়াল মাধ্যমের চেয়েও বেশি।

তাঁর ভাষায়, মসজিদ হচ্ছে “প্রতিরোধের কেন্দ্র”— সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, এমনকি প্রয়োজনে নিরাপত্তা ও সামরিক প্রতিরোধেরও কেন্দ্র।
[১৩৯৫/৫/৩১ — ২১ আগস্ট ২০১৬]

যেখানে প্রতিরোধ করেছি, সেখানেই সফল হয়েছি
তিনি বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ফলপ্রসূ হয়। পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধ, নিরাপত্তা সংকট কিংবা অর্থনৈতিক চাপ— সবক্ষেত্রেই প্রতিরোধের মাধ্যমে সফলতা এসেছে।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, একসময় ইরানের বার্ষিক তেল আয় ছিল মাত্র পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলার। তা সত্ত্বেও জনগণ প্রতিরোধ করেছে এবং দেশ টিকে থেকেছে।

তাঁর মতে, অর্থনৈতিক প্রতিরোধের অর্থ হলো— দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কাঠামোকে শক্তিশালী করা, মজবুত ভিত্তি গড়ে তোলা এবং জাতীয় সমস্যাগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করা।
[১৩৯৮/২/২৪ — ১৪ মে ২০১৯]

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha